বানিয়াচং পরিবার পরিকল্পনা অফিসের ডা. সুবিমলের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত ও যৌন হয়রানির অভিযোগ

Sharing is caring!

বানিয়াচং প্রতিনিধি : বানিয়াচং উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের মেডিকেল অফিসার ডাক্তার সুবিমল চন্দ’র বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারী অর্থ আত্মসাত ও নারী কর্মচারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রোমেনা বেগম সিলেট বিভাগের পরিচালক মো. কুতুব উদ্দিন চৌধুরীর নিকট লিখিতভাবে এমন অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ডাক্তার সুবিমল চন্দ নিজ এলাকা বানিয়াচংয়ে যোগদানের পর থেকে নানা ধরণের অনিয়ম করে যাচ্ছেন। অনিয়মের মাধ্যমে তিনি গত অর্থ বছরে ক্লিনিক অধিক্ষেত্রের ৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেন। তার অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে নিজে দুর্ব্যবহারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অফিসে ডেকে নিয়ে তাদের দ্বারা অধিনস্ত কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান। এছাড়া প্রতিবাদ করলে শান্তিতে চাকুরী করতে দেবেন না, বদলী করে দেবেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণের কাছে অভিযোগ করেও কাজ হবে না, তারা তার নিজস্ব লোক ইত্যাদি কথাবার্তা বলে অধিনস্ত কর্মচারীদের শাসান।

অভিযোগকারী রোমেনা আরো উল্লেখ করেন, গত এক বছর নিজের টাকায় ইমপ্রেস্ট ফান্ড ক্যাম্প পরিচালনার পাওনা টাকা চাওয়ায় ডাক্তার সুবিমল তাকে ফাঁসাতে পরিবার পরিকল্পনা সহকারী রিপন দেবনাথ ও পিয়ন আবুল কালামের মাধ্যমে ইমপ্রেস্ট ফান্ডের ফাইল চুরি করান। এছাড়া তিনজনে মিলে রোমেনাকে যৌন হয়রানি করেন। গত জুলাই মাসে ডাক্তার সুবিমল ক্লিনিক অধিক্ষেত্রের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেবেন বলে রোমেনার নিকট ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবী করলে তন্মধ্যে রোমেনা ২০ হাজার টাকা দেন এবং অবশিষ্ট টাকার জন্য ডাক্তার সুবিমল পিয়ন কালামের মাধ্যমে রোমেনাকে চাপ প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে প্রেরকবিহীন চিঠির মাধ্যমে ডাক্তার সুবিমলের স্বাক্ষর সম্বলিত কিছু বিল ভাউচার ডাকযোগে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে প্রেরণ করা হয়। এসবের সাথে প্রেরিত বেনামি চিঠিতে ভূয়া ভাউচারের মাধ্যমে ডাক্তার সুবিমল কর্তৃক সরকারী অর্থ আত্মসাত ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কর্মচারীদের শ্রান্তি বিনোদন, ভ্রমণ ভাতা বিল ও স্যাটেলাইট ভাতা বিল কম দিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিন বিভিন্ন দোকানে গিয়ে বানিয়াচং উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের মালামাল ক্রয়ের ভাউচার দেখালে দোকানীরা এসব ভাউচার তাদের দোকানের নয় বলে জানান। তারা এসব ভাউচারকে বানোয়াট ও ভূয়া ভাউচার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কোন কোন দোকানী তাদের দোকানের নামে ভূয়া ভাউচার তৈরী করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ডাক্তার সুবিমলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান। এই ভাউচারগুলোর মধ্যে গায়েবী দোকানের ভাউচারও রয়েছে। হবিগঞ্জ কালীবাড়ী রোডে শামীম স্টোর নামে একটি দোকান থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকার মালামাল ক্রয় করা হয়েছে মর্মে একটি ভাউচার পাওয়া গেলেও এ নামে হবিগঞ্জ কালীবাড়ী রোডে কোন দোকান পাওয়া যায়নি। এ রোডে প্রায় ৪০ বছর ধরে ব্যবসা করছেন এমন দোকানীরা জানান, কোনদিন এই দোকানের সাইনবোর্ড তাদের চোখে পড়েনি বা দোকানের মালিকক শামীম আহমেদকেও তারা চেনেনা। এমন দোকানের ভাউচারও রয়েছে যে দোকানে যেসব পন্য কখনোই বিক্রয় করা হয়না সেসব পন্য ক্রয় করার কথাও ভাউচারে লেখা। এছাড়া যাচাইকৃত প্রতিটি ভাউচার একই হাতের লেখা।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পরিবার পরিকল্পনার মাঠকর্মীদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ডাক্তার সুবিমল স্যাটেলাইট ভাতা বিলসহ এমন কোন বিল নেই যা থেকে শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ টাকা কেটে রাখেননি। তারা বলেন, শ্রান্তি বিনোদন ও ভ্রমণ ভাতা বিল ব্যাংক একাউন্টে পরিশোধের নিয়ম থাকলেও ৩০/৪০ পার্সেন্ট টাকা আত্মসাত করতে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে সবসময় হাতে হাতে পরিশোধ করে থাকেন। কর্মচারীদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন দেবার জন্যও তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ নেন। আইওডি নষ্ট বাবদও কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা দাবী করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিটি নষ্ট আইওডি’র জন্য ১৫ ডলার করে টাকা দাবী করেন ডাক্তার সুবিমল। এছাড়া জন্ম বিরতিকরণের স্থায়ী পদ্ধতি ক্যাম্পে মেরী স্টোপস থেকে ক্লায়েন্ট রেফারকারীর নাস্তা ববাদ বরাদ্দকৃত জনপ্রতি একশত টাকাও নাস্তা না করিয়ে ডাক্তার সুবিমল আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। আয়াদের নামে ভ্রমণ ভাতা বিল তৈরী করার নিয়ম না থাকলেও ডাক্তার সুবিমল ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে তাদের নামে ভ্রমণ ভাতা তৈরী ও উত্তোলন করে আত্মসাত করেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী ডাক্তার সুবিমলের অফিস টাইম সকাল ৯টা থেকে ৫টা হলেও তিনি বিকাল ৩টা থেকে প্রতিদিন বড়বাজারের শাপলা মেডিকেলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। যা তার স্বাক্ষরিত প্রেসক্রিপশনেও উল্লেখ রয়েছে।

এসব অনিয়ম-দুর্নীতি ও যৌন হয়রানির ব্যাপারে ডাক্তার সুবিমল চন্দ’র বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদেরকে কোন বক্তব্য দেননি।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডাক্তার নাসিমা খানম ইভা’র দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোন বক্তব্য না দিয়ে ডাক্তার সুবিমলের কাছ থেকেই বক্তব্য নিতে বলেন। বার বার ডাক্তার সুবিমলের বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের পাশ কাটিয়ে যান।

এ বিষয়ে ভূক্তভোগীসহ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের দুর্নীতি তদন্তে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বানিয়াচংবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *